← Back
📚 Book

তেতুল বনে জোছনা — হুমায়ূন আহমেদ

3 min read

তেতুল বনে জোছনা বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য উপন্যাস, যার মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদ একটি সামাজিক চিত্র, মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব এবং ভালোবাসার গভীর শক্তিকে তুলে ধরেছেন। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর স্বভাবসুলভ সহজ ভাষায় জটিল আবেগকে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যা পাঠককে নিঃশব্দে ভাবতে বাধ্য করে।

তেতুল বনে জোছনা বইটিতে অনেকগুলি ক্যারেক্টারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতি মিয়া, জহির খাঁ, ডক্টর আনিস ও তার স্ত্রী নবনী।

মতি মিয়া

মতি মিয়া উপন্যাসের একটি রহস্যময় ও আকর্ষণীয় চরিত্র। তিনি মিথ্যা বলেন, চুরি করেন - কিন্তু তার ভেতরে এক সরলতা এবং গভীর ভালোবাসা কাজ করে। তার সকল কার্যক্রম পাঠক মনে খুশির সঞ্চার ঘটায়। পাঠক বারবার দ্বিধায় পড়বে - তিনি কি খারাপ মানুষ, নাকি ভালো মানুষ?

মতি মিয়ার একটি সংলাপ উদ্বৃতি না করলে আমি শান্তি পাচ্ছি না। মতি মিয়া মর্জিনার জন্য ঝড়ে মরে পরে থাকা ডাহুক পাখির তরকারি রেধে নিয়ে গিয়ে তাকে বলছে —

ডাহুক পাখির ছালুন দিয়া খাওয়ার রিজিক পাশ হইছে বইলা তো আর পাখিন সালুনের বাটি আসমান থাইক্যা নাইম্যা তোমার কোলে পড়ব না। কাজেই আল্লাহ পাক একটা ঝড়ের ব্যবস্থা করল। বাড়ি ঘর উল্টাইল, মানুষের বিরাট ক্ষতি হইল, পশু পাখি মরল - ডাহুক পাখি মরল বইলা ডাহুক পাখির সালুন পাইলা। এখন ঘটনা চিন্তা কর - তোমারে খাওয়ানির জন্যে আল্লাহপাকরে কী যন্ত্রণা করন লাগল। যা বললাম এর মধ্যে জঠিল চিন্তার বিষয় আছে। মাথা ঠান্ডা কইরা চিন্তা করো।


জহির খাঁ

গ্রামের চেয়ারম্যান জহির খাঁ ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতীক। তিনি গ্রামীণ রাজনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন— যেখানে ক্ষমতা মানেই সবসময় নৈতিকতা নয়।

ডাক্তার আনিস

ডাক্তার আনিস। সহজ সরল এবং ভালো মানুষ। বিরাটনগর গ্রামে ডাক্তার হিসেবে এসে মানুষের ভালোবাসায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। লেখক এক জায়গায় বলেছেন—

মানুষের ভালোবাসায় যে অভ্যস্ত হয়ে যায়, সেই ভালোবাসা না পেলে সে অথৈ জলে পড়ে যায়।

এই লাইনটি শুধু ডাক্তার আনিসের অভিজ্ঞতা নয়। এটি তাদের সকলের জন্য প্রযোজ্য, যারা মানুষের ভালোবাসাকে জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি মনে করে বাঁচে।

নবনী

নবনীর চরিত্র মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শৈশবে বাবা-মায়ের সম্পর্কের ভাঙন তার মনে আঘাত সৃষ্টি করে। ফলে তার নিজের দাম্পত্য জীবনেও অনিশ্চয়তা কাজ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার শক্তিই তাকে স্থির করে। নবনী শেষ পর্যন্ত ডাক্তার আনিসের সাথে চিরকাল থেকে যাওয়া অভিপ্রায় ব্যক্ত করে বলেন,

"ডাক্তার সাহেব, তুমি আমার জন্যে দু'ফোটা চোখের জল ফেলেছ-তার প্রতিদানে আমি 'জনম জনম কাঁদিব'।"

এই সংলাপটি আত্মসমর্পণের নয়। এটি উপন্যাসের একটি বিশেষ আবেগের বহিঃপ্রকাশ।


উপন্যাসে সহজ ভাষার আড়ালে হুমায়ূন আহমেদ এক মানবিক সত্য তুলে ধরেছেন - 'মানুষ আসলে ভালোবাসা ছাড়া অপূর্ণ'।